Search Here

Most Recent

২৩ আগস্ট, ২০২১

Drain of Wealth | সম্পদের নিষ্ক্রমণ | Modern Indian History

 Drain Of Wealth | Modern Indian History


www.gkghor.in
Drain Of Wealth | Modern Indian History | Indian History MCQ Question Answer | History GK



সম্পদের বহির্গমণ  

 ইংরেজ আমলে ভারতীয় অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে ঐতিহাসিক ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এখনও আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসার অন্ত নেই। ব্রিটিশ ভারতের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ আধুনিক ঐতিহাসিকদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করলেও অতীতেও যে এ ধরনের চর্চা হয়নি তা কিন্তু নয়। উনিশ শতকের শেষ পর্বে জাতীয়তাবাদী অর্থনীতিবিদ ও ঐতিহাসিকগণ সাম্রাজ্যবাদীদের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে দেখতে চেয়েছেন যে ইংরেজ আমলে ভারতে কোন আর্থিক প্রগতি হয়নি বরং ভারতীয় জনগণের অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়েছিল ভারতের সাবেকি অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে ইংরেজরা দেশের স্বার্থে উপনিবেশিক অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল তারপরেও অগ্রগতির পথে বাধা এসেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছিল। ভারত কৃষিপ্রধান দেশ হলেও বারবার দুর্ভিক্ষ কবলিত হয়েছে। জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক দের মধ্যে আমরা দাদাভাই নওরোজি, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও রমেশচন্দ্র দত্তের নাম উল্লেখ করতে পারি যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন।


 সম্পদের নিষ্কাশন (Drain Of Wealth) ::

 দাদাভাই নওরোজি বা রমেশচন্দ্র দত্ত ইংরেজিতে যাকে "Drain Of Wealth" বলেছেন বাংলায় তার অসংখ্য প্রতিশব্দ আছে। আবার অনেকে বলেছেন প্রতিদানহীন চালান, কেউবা সম্পদ নিষ্কাশন। Professor সব্যসাচী ভট্টাচার্য তার "উপনিবেশিক ভারতের অর্থনীতি" নামক বইটিতে এক জায়গায় এর বাংলা করেছেন 'ধন নির্গম ও ধন নির্গমন' আবার অন্যদিকে অনেকে বলেছেন ধন নিঃসরণ।



 কোম্পানির আমলে সম্পদ নিষ্কাশন এর প্রকৃতিঃ

১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের  মে মাসে লন্ডন ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের (East India Association) সভায় দাদাভাই নওরোজি (Dada Bhai Naoroji) সর্বপ্রথম এই বক্তব্য পেশ করেন যে ইংল্যান্ড ভারত শাসনের মূল্য স্বরূপ এখান থেকে সম্পদ নিয়ে মাতৃভূমিকে সমৃদ্ধশালী করেছে এবং তার ফলে ভারত রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। দাদা ভাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিচারপতিরা নাচে ভোলানাথ চন্দ্র একই ধরনের বক্তব্য তুলে ধরেন। এরপর জি.ভি. যৌশি, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মদনমোহন মালব্য, ওয়াচা, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমূখ গণ্যমান্য ভারতীয় এই তথ্য নিয়ে শোরগোল শুরু করে দেন। কলকাতায় অমৃতবাজার পত্রিকা এই বিষয়ে লেখালেখি শুরু হয়।


 কোম্পানির আমলে সম্পদ নিষ্কাশন এর যে প্রকৃতি ছিল 1858 সালের পরবর্তী ইংরেজ আমলে একই রকম ছিল কিনা জানা নেই। কোম্পানির আমলে গোড়ার দিকে মূল সমস্যা ছিল ভারতের তৈরি সুতি বস্ত্র ও রেশম শিল্প সামগ্রী চাহিদা ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বাজারে যথেষ্ট থাকলেও ইংল্যান্ড বা ইউরোপের তৈরি দ্রব্যসামগ্রীর কোনো চাহিদা ছিল না। এর ফলে ইংল্যান্ড থেকে বহু মূল্যবান ধাতুর সামগ্রী এনে এইসব দ্রব্য ভারত থেকে কিনতে হতো। এইভাবে বহুমূল্যবান শোনাবার উপর চালান কেউই পছন্দ করত না। পলাশীর যুদ্ধের পর এবং 1765 সালে কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে ইংল্যান্ড থেকে বহু মূল্যবান ধাতু আনার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এরপর থেকেই এখানকার টাকা দিয়েই দ্রব্য সামগ্রী কিনে ইংল্যান্ডে পাঠানো হতো এইভাবে সম্পদ নিষ্কাশন শুরু হয়।


 

কোম্পানির আমলে সম্পদের নিষ্কাশনঃ

 কোম্পানির হাত থেকে রাজের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার পর সম্পদ নিষ্কাশন এর প্রকৃতির রদবদল ঘটায়। লন্ডন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যালয়ের পেপার বা তার অংশীদারের লাভ বংশ প্রদান করার দায়িত্ব আর না থাকলেও ভারত সচিবের ইন্ডিয়া অফিসের যাবতীয় খরচ ভারত থেকে উসুল করা হতো। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পদে যেসব ইংলিশ কর্মচারী অধিষ্ঠিত ছিলেন তাদের বেতন, বিভিন্ন ভাতা,সঞ্চয় ইত্যাদি সবই ভারত থেকে ইংল্যান্ডের চালান করা হতো। অন্যদিকে ভারতের বিভিন্ন পুচির বিনয়োগ এর ফলে বিভিন্ন সংস্থা লাভ করতো তাও ইংল্যান্ডে চলে যেত।


 জাতীয়তাবাদী লেখকদের বক্তব্যঃ

 সম্পদের নিষ্কাশন এর ফলে কেবলমাত্র ভারতের সম্পদি বাইরে চলে যায়নি ভারতের পুঁজিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী লেখকদের মধ্যে ভারতের সমস্ত আর্থিক দুর্বলতা ও দারিদ্র্যের জন্য দায়ী ছিল ক্রমবর্ধমান এই ধন নিষ্কাশন। রমেশচন্দ্র দত্তের ভাষায়- "When the taxes raised in a country are remitted out of it, the money is lost to the country for ever; it does not stimulate her trades or industries, or reach the people in any form".  অনেক জাতীয়তাবাদী লেখক এর মতে ভারতের আধুনিক শিল্প বিকাশের গতি মন্থর জন্য দায়ী ছিল সম্পদের নিষ্কাশন। এর ফলে ভারতে বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ সহজ হয়েছিল।রমেশ চন্দ্র দত্ত নিষ্কাশন এর সঙ্গে ভারতীয় কৃষকদের সর্বনাশের একটা যোগসূত্র তুলে ধরেছেন। রমেশ চন্দ্র দত্ত বলেছেন ভারতের দরিদ্র কৃষকদের শোষণ করে রাজস্ব তোলা হতো এবং ইংল্যান্ডের পাচার করে দেওয়া হতো।


 জাতীয়তাবাদী লেখকরা সুপারিশ করেছিলেন যে অধিকাংশ সামরিক ও বেসামরিক পদে একমাত্র ভারতীয় কর্মচারীদের নিয়োগ করা উচিত। অন্যান্য যে সমস্ত খাতে ভারত থেকে অর্থ ব্যয় করা হয় তাও কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সম্পদ নিষ্কাশন এর যে তত্ত্ব নওরোজি বা রমেশ চন্দ্র দত্ত জোরালো ভাষায় তুলে ধরেছিলেন আজকের দিনে অনেকেই তা অতিরঞ্জিত বলে মনে করে থাকেন। এদের মূল বক্তব্য হলো ভারতের সম্পদ ইংল্যান্ডে চালান হলেও এই সম্পর্ক একতরফা ছিল না, বিনিময় ভারত কিছু পেত। ভারতের রেলপথের সম্প্রসারণ, জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতির,ব্রিটিশ পুঁজির বিনিয়োগের ফলে শিল্পোন্নয়ন, বিভিন্ন ধরনের অদৃশ্য সেবা, দক্ষ প্রশাসন, শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ইত্যাদির জন্য ভারতের ইংল্যান্ডের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। রমেশচন্দ্র দত্ত এই সব লেখকদের যুক্তি খন্ডন করে সম্পদ নিষ্কাশন তত্ত্ব কে কেন্দ্র করে যে বাদানুবাদ চলছিল তা তীব্রতর করে ছিলেন।


 সমালোচনাঃ

 নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত এবং অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী লেখকদের মধ্যে যে তর্ক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে আমরা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে হাতিয়ার হিসেবে এই তত্ত্বটি তাৎপর্য অপরিসীম। দাদাভাই নওরোজি মত উদারপন্থী নেতা এই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যেহেতু সম্পদ নিষ্কাশনই ভারতের সমস্ত সমস্যা ও দরিদ্র তার মূল কারণ, সেহেতু ভারতকে এই অনিবার্য সর্বনাশ এর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে স্বশাসন ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। অনেকে আবার মনে করেন তারা বাড়াবাড়ি করছেন। তাদের মতে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রপ্তানি উদ্বৃত্ত মোট জাতীয় আয়ের একটা ক্ষুদ্র অংশ ছিল মাত্র।ডঃ কে এন চৌধুরী মন্তব্য করেছেন যে কতটা সম্পদ নিষ্কাশিত হয়েছে তা বার করতে হলে রপ্তানি মূল্য থেকে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিতে হবে। অন্যদিকে রেলপথ নির্মাণে ব্রিটিশ পুঁজি বিনিয়োগের দরুন ভারতকে সুদের বোঝা বইতে হয়েছে তা হয়তো অনভিপ্রেত হলেও অনিবার্য ছিল। অর্থাৎ কোনো কিছু পেতে হলে তার মূল্য দিতেই হবে।


 উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এই বলতে পারি যে, সম্পদ নিষ্কাশনের ব্যাপারটা পুরোপুরি একতরফা ছিল না। কিন্তু এসব কথা বলা সত্ত্বেও নওরোজি ও তত্ত্বের মূল বক্তব্য বিশ্লেষণে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। তাদের অনেক বক্তব্যই যেমন মাতাবাড়ি প্রশাসন, উচ্চপদে ইংলিশ কর্মচারীদের নিয়োগ জনিত সম্পত্তি নিষ্কাশনের প্রতি যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ছিল। ভারত থেকে যে পরিমাণ অর্থ ইংল্যান্ডে চালান হয়ে যেত তা যদি ভারতেই থাকতো অর্থাৎ সেই উদ্বৃত্ত অর্থ যদি ভারতে বিনিয়োগ করা হতো তাহলে ভারতের জাতীয় আয়ের আরো বৃদ্ধি পেত। নওরোজের এই বক্তব্য উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে যারা মনে করেন যে ভারতে ব্রিটিশ পুঁজির বিকাশ ও রেলপথ স্থাপনের ফলে আধুনিকতার হাওয়া বইতে শুরু করেছিল তাদের বক্তব্য সম্প্রতি কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন