Search Here

Most Recent

৮ আগস্ট, ২০২১

গান্ধীজী ও সত্যাগ্রহ আন্দোলন | Contribution of Gandhiji in National Movement | Indian History

  Gandhiji's Contribution in Indian Polity And National Movement

গান্ধীজী ও সত্যাগ্রহ আন্দোলন  

www.gkghor.in
Gandhiji and Indian National Movement | Modern Indian History | History Question Answer


গান্ধীজীর উত্থান :

১৯১৯ সালে যথেষ্ট পরিণত বয়সে যখন গান্ধীজী ভারতের রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন, তখন তাকে একপ্রকার কেউ জানত না। কিন্তু 1919 সালের রাওলাট সত্যাগ্রহ আন্দোলনে তাকে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অভিষিক্ত করে। অপরের এই বাধা অবশ্য তার পক্ষে আশীর্বাদস্বরূপ ছিল। লক্ষ্যের দিক থেকে তিনি বহুদিন নরমপন্থীদের অনেক কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু অন্ধের মতো তিনি তাদের অনুসরণ করেননি। অন্যদিকে চরমপন্থীদের অসহযোগিতা ও বয়কট নীতি সমর্থন করেছিলেন।১৯১৯ থেকে ১৯৪৭  সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। মাত্র একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে জাতীয় আন্দোলন এর আগে কোনদিন পরিচালিত হয় নি।


রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে তিনি বেছে নিলেন সত্যাগ্রহের আদর্শ। সত্যাগ্রহের দুটি দিক একটি সত্যবাদিতা, অপরটি অহিংসা। গান্ধীজীর সারাজীবনের সারাংশ হল সত্যের জন্য সংগ্রাম। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যে শুদ্ধ তেজ বা শক্তি থাকে, গান্ধী তাকেই বলেছেন সত্যের শক্তি, আবার অপর নাম প্রেমের শক্তি।


 চম্পারন সত্যাগ্রহ (Champaran Satyagraha) :

বিহারের চম্পারন নীলকর সাহেবরা তিন কাঠিয়া প্রথা কৃষকদের তাদের জমির 20 তৃতীয়াংশ নীল চাষ করতে বাধ্য করত। উনিশ শতকের শেষদিকে জার্মান কৃত্রিম নীল আবিষ্কারের পরে নীলের চাহিদা পড়ে যায়। ফলে নীলকর সাহেবরা কৃষকদের বাধ্যতামূলক নীলচাষ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মূল্য স্বরূপ ও অন্যান্য জবরদস্তি করের হার অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরেই কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। রাজকুমার শুক্লা নামে স্থানীয় একজন নেতা এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিকার করার জন্য গান্ধীর শরণাপন্ন হন। এই আবেদনে সাড়া দিয়ে গান্ধীজী চম্পারণে প্রবেশ করার পরেই কমিশনার তাকে চম্পারন ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু গান্ধীজী এই আদেশ অমান্য করেন এবং এই জন্য যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি হন। সরকার শেষ পর্যন্ত চম্পারন নিয়ে অনুসন্ধান কমিশন বসাতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং গান্ধীজী হয়েছিলেন এই কমিশনের একজন সদস্য। তিন কাঠিয়া প্রথা তুলে দেওয়া হয় এবং খাজনার হার ও শতকরা কুড়ি থেকে 26 ভাগ কমিয়ে দেওয়া হয়।


 খেদা সত্যাগ্রহ (Kheda Satyagraha) :

গুজরাটের খেদা অঞ্চলের গান্ধীজীর ভূমিকা ছিল অনেক বেশী দীর্ঘস্থায়ী। এখানকার কিছুটা সচ্ছল ও অবস্থাসম্পন্ন কুনবি পতিদার কৃষকরা খাদ্যশস্যের পাশাপাশি তামাক ও তুলোর চাষও করত। কিন্তু বার বার দুর্ভিক্ষ ও প্লেগের আক্রমণের এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখের অবধি ছিল না। ১৯১৭-১৮  সালে খাদ্য উৎপাদন বিশেষভাবে ব্যাহত হয় এবং কেরোসিন তেল, কাপড়, লবণ প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থায় কৃষকেরা খাজনা কমাতে চাইলে সরকার সেই আবেদনে সাড়া দেয়নি। কিন্তু সমস্ত আবেদন নিবেদন নীতি ব্যর্থ হওয়ায় গান্ধীজী কৃষকদের খাজনা বয়কটের নির্দেশ দিলেন। নবীন আইনজীবী বল্লভ ভাই প্যাটেল ও ইন্দুলাল সহ কয়েকজন তরুণ অনুচর নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের বয়কট আন্দোলনের উৎসাহিত করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত গান্ধীজীর জানতে পারেন যে, যে সমস্ত কৃষক খাজনা দিতে সক্ষম সরকার একমাত্র তাদের কাছ থেকেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিল। এই অবস্থায় গান্ধীজী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তবে আন্দোলন যেভাবে শেষ হয়, তাতেই তিনি খুশি হন নি।


 আমেদাবাদ সত্যাগ্রহ (Ahmedabad Satyagraha) :

চম্পারন ও খেদা সত্যাগ্রহ এর পরই গান্ধীজীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো আমেদাবাদে সুতাকল শ্রমিকদের দাবি দাওয়ার প্রতি। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি ছিল মালিক শ্রমিক পক্ষের বিরোধের মূল কারণ। যুদ্ধের ফলে আমেদাবাদের মিল মালিকদের পৌষ মাস আসে। ইউরোপ থেকে বিদেশি জিনিস আমদানিতে টান পড়ে। সেই সুযোগে স্থানীয় বাজারে ভারতে তৈরি জিনিসের চাহিদা বাড়ে। ফলে মিল মালিকদের মুনাফা বাড়ে দিনের পর দিন। কিন্তু তাতে শ্রমিকদের দুঃখের অন্ত ছিল না। যুদ্ধের সময় সব জিনিসের দাম বাড়ায় তাদের দুঃখ-কষ্ট বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকেরা 50% মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানাতে থাকে। মিলমালিকরা কুড়ি শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি ছিল। এই পরিস্থিতিতে ইংরেজ কালেক্টর গান্ধীকে মধ্যস্থতা করার জন্য আবেদন জানালেন। মালিকরা যাতে শ্রমিকদের দাবি মেনে নেন গান্ধী তার জন্য সচেষ্ট হলেন। কিন্তু মালিকরা গান্ধীর কথা শুনলেন না, গান্ধীজীর নির্দেশে ধর্মঘট শুরু হলো। তিনি প্রতিদিন সবরমতী নদীর তীরে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ অটল থাকায় এবং শ্রমিকদের মধ্যে অস্থিরতার ভাব লক্ষ্য করে গান্ধীজি প্রথম অনশনের অস্ত্র প্রয়োগ করেন। শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ 35% মজুরি বৃদ্ধি করতে রাজি হয় ও ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।


 রাওলাট সত্যাগ্রহ (Rawlat Satyagraha) :

বৈপ্লবিক ও সন্ত্রাসবাদি কার্যকলাপ বৃটিশ সরকারকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল। তাই সরকার তা মোকাবিলা করার জন্য সিডনি রাওলাটের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য একটি আইন প্রণয়ন করার সুপারিশ করেছিল। এই আইনে জরুরী কালীন ব্যবস্থা হিসাবে সরকারকে বিশেষ ক্ষমতা দানের প্রস্তাব করা হয়। যেমন জুড়ি ছাড়াই রুদ্ধদ্বার আদালতে বিচার, সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা টাকা জামানত আদায়, তাদের আবাসস্থল এর উপর নজর রাখা, আপত্তিকর কাজকর্ম থেকে তারা যাতে বিরত থাকে তার ব্যবস্থা করা, বিনা বিচারে আটক ইত্যাদি। ভারতীয়রা এক বাক্যে এই দমনমূলক আইন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে।


এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসাবে গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ সভা গঠন করলেন। এরপর তিনি একটি শপথনামা রচনা করে নিজে তাতে স্বাক্ষর করেন ও অন্যান্য সত্যাগ্রহীদের স্বাক্ষর করার নির্দেশ দেন। স্থির হয় এইসব স্বাক্ষরকারী আইন অমান্য করে গ্রেফতার বরণ করবেন। এরপর গান্ধীজী 30 শে মার্চ এক ব্যাপক হরতালের ডাক দেন। অন্যদিকে লখনৌ এর আব্দুল বারী, লীগের তরুণ নেতা আনসারী প্রভৃতি মুসলিম নেতা ও গান্ধীর হাত শক্ত করে হিন্দু মুসলিম ঐক্য এই আন্দোলনকে বাড়তি শক্তি দিল। গান্ধীজী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করে মানুষের মনে উৎসাহ সঞ্চার করলেন।

রাওলাট সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রভাব ভারতের সর্বত্র সমান ভাবে অনুভূত হয়নি। প্রস্তুতি সর্বভারতীয় আন্দোলন হিসেবে দাবি করা হলেও রাওলাট সত্যাগ্রহ সমগ্র ভারতকে স্পর্শ করতে পারেনি। প্রথম দিকে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এপ্রিল মাসের গোড়া পর্যন্ত এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল বোম্বাই প্রেসিডেন্সি, প্রধানত ও আমেদাবাদ শহর। শহরের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও কারিগর শ্রেণীর মানুষ অবশ্য এই আন্দোলন সম্পর্কে আগ্রহ দেখিয়ে ছিলেন।


   এই ভাবেই গান্ধীজী ভারতের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। এরপর তিনি খিলাফত আন্দোলন থেকে শুরু করে অসহযোগ আন্দোলন এবং তারপর আইন অমান্য আন্দোলন প্রকৃতি আন্দোলনের মাধ্যমেই তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং সকলের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।


*Source (Book) আধুনিক ভারতের রূপান্তর -  রাজ থেকে স্বরাজ (১৮৫৮-১৯৪৭)




 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন