Search Here

Most Recent

৯ আগস্ট, ২০২১

উনিশ শতকে ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন | Renaissance in 19th Century in India

Modern Indian History | Renaissance in India in 19th Century  

www.gkghor.in
Modern Indian History | Indian History | History Question Answer

ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন

পাশ্চাত্য শিক্ষা (Western Education) ও সংস্কৃতির পরশে এবং খ্রিস্টান মিশনারীদের চেষ্টায় ধর্ম প্রচারের ফলে হিন্দুধর্ম (Hinduism) ও সমাজের যে আলোড়ন উঠেছিল উনিশ শতকের গোড়ায়, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল দু ভাবে। প্রথমত, রামমোহন রায় (Raja Rammohan Roy) ও বিদ্যাসাগর (Iswar Chandra Vidyasagar) এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে হিন্দুধর্ম ও সমাজের কুপ্রথা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা হয়েছিল এবং নিজেদের জীবন বিপন্ন করে, তারা ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজে নিজেদের অবিচল রেখেছিলেন। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত একদল আবেগ প্রবণ বাঙালি যুবক ডিরোজিওর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে, হিন্দু ধর্মকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে হিন্দু সমাজে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হলেও হিন্দু ধর্ম ও সমাজ যে চরম সঙ্কটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল স্পষ্টভাবে বোঝা গিয়েছিল। হিন্দু ধর্মের মধ্যে শুরু হয় নতুন করে নানা রকম ভাবনা চিন্তা ও আন্দোলন। উনিশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে ভারতের ধর্মজীবন ছিল বিভিন্ন মতাদর্শ ও চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ।


 ব্রাহ্ম সমাজ (Brahma Samaj) :

ব্রাহ্মসমাজের পথিকৃৎ ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। ১৮২৮ সালে যখন তিনি ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন তখন তিনি তার একটি স্বতন্ত্র ধর্ম মত বা ধর্ম সম্প্রদায় গঠন করার কোন উদ্দেশ্য গ্রহণ করেননি। হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকেই তিনি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজে নিজেকে ব্রতী করে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয় কুমার দত্ত ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃত্ব দান করেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কেশব চন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাহ্মসমাজের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল।


 কেশব চন্দ্র সেন (Keshav Chandra Sen) জন্মগ্রহণ করেছিলেন নিষ্ঠাবান এক বৈষ্ণব পরিবারে। হিন্দু কলেজের ছাত্র কেশব চন্দ্র সেন দর্শনশাস্ত্র অধ্যায়ন করেছিলেন ওই কলেজের অধ্যাপক জোন্স এর কাছে। বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যেও তার দখল ছিল। ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গেই কেশবচন্দ্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নজরে পড়েন। মহর্ষি তার প্রতিভায় মুগ্ধ হন। 1862 সালে তিনি আশ্চর্য পদে অভিষিক্ত হন। কেশবচন্দ্র সেনের আদর্শ ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় ভাব ও চেতনার পুনরুজ্জীবন ঘটানো এবং রামমোহন রায় প্রবর্তিত ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজ কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে, নারী শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে, অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদ প্রথার বিলুপ্তি ঘটিয়ে, বিভিন্ন সামাজিক অবস্থার অবনতি করে তিনি এক সামাজিক বিপ্লব আনতে চেয়েছিলেন। ১৮৫৫ সালে তিনি বয়স্কদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য কলকাতার কলুটোলায় একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। স্ত্রী শিক্ষা বিস্তার ও নারী মুক্তি আন্দোলন জোরদার করার উদ্দেশ্যে তিনি 1862 সালের ব্রাহ্ম বন্ধু সভা প্রতিষ্ঠা করেন।১৮৬৫ সালে তিনি ব্রাহ্ম মহিলাদের জন্য ব্রাহ্মিকা সমাজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। জনগণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি মাতৃভাষার (Mother Tongue) মাধ্যমে শিক্ষাদান এর পক্ষপাতী ছিলেন।


সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা প্রসারে কেশবচন্দ্র সেনের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হলেও তিনি ছিলেন মূলত একজন ধর্ম প্রচারক। ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের প্রথম ভাঙ্গন তার নেতৃত্বেই ঘটেছিল। রামমোহন রায় ও দেবেন্দ্রনাথের পর কেশবচন্দ্র সেন এই আন্দোলনের ঐতিহ্য অটুট রাখেন। যদিও তার সময়ে ব্রাহ্মসমাজে দুবার ভাঙ্গন ধরেছিল এবং বারবার এই ভাঙ্গনের ফলে এই আন্দোলন কিছুটা গতিহীন ও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। তবু কেশবচন্দ্রের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাই বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই আন্দোলনের ব্যাপকতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল।


 প্রার্থনা সমাজ (Prarthana Samaj) :

বোম্বাইতে (Presently Mumbai) ধর্মসংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল পরমহংস মন্ডলীর প্রচেষ্টায়। গোপালহরি দেশমুখ বা লোকহিতবাদী নামে অধিক যিনি পরিচিত, হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে লেখনি তিনিই প্রথম ধরেন। তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক সাম্যের বাণী প্রচার করেন। তিনি প্রজাতন্ত্র ও পণ্ডিতদের অজ্ঞতার বিরুদ্ধে কলম তুলে নেন। গোপালহরি দেশমুখ ব্রাহ্মণদের প্রধান্য অস্বীকার করেন। প্রার্থনা সমাজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আত্মরম পান্ডু রং (Atma Ram Pandurang)। ১৮৬৮ সালে কেশবচন্দ্র বোম্বাই ভ্রমণ করতে আসেন এবং প্রার্থনা সমাজের সংগঠন শক্তিশালী করেন। রামকৃষ্ণ গোপাল ভান্ডারকর ও মহাদেব গোবিন্দ রানাডে(Mahadev Gobinda Ranade) প্রার্থনা সমাজের যোগদান করার পরেই এই আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ও অধ্যাপক ভান্ডারকর এবং দক্ষ প্রশাসক, বিচারপতি ও ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ছিলেন প্রার্থনা সমাজের দুই প্রাণপুরুষ। প্রার্থনা সমাজের অনুগামীরা হিন্দুধর্ম ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে কোন নতুন ধর্ম বা সম্প্রদায় গড়ে তোলেননি। তাদের প্রেরণার উৎস ছিল বিখ্যাত সাধক রামদেব, তুকারাম ও রামদাস। তারা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন এবং আনুষ্ঠানিক পূজা-অর্চনার উপর তাদের কোনো রকম আস্থা ছিল না।


প্রার্থনা সমাজের যতটা না ধর্ম সংস্কারের দিকে মন দিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখেছিল সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে। জাতিভেদ প্রথা, পর্দাপ্রথা, অস্পৃশ্যতা, বাল্যবিবাহ, সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে তারা আন্দোলন করেছিলো। তারা অসবর্ণ বিবাহ, বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা বিস্তার প্রভৃতি প্রগতিশীল ও আধুনিক সংস্কারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দিতে চেয়েছিলেন। বাল্যবিবাহের স্বার্থ রক্ষার জন্য এবং তাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে মহাদেব গোবিন্দ রানাডে সর্বদা চেষ্টা করতেন। এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা সারদা সদন নামে একটি সংস্থা কে তিনি সর্বান্তকরণে সমর্থন করেছিলেন। রানাডের মত ভান্ডারকারও বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা প্রভৃতি সামাজিক কু প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বিধবা বিবাহ সমর্থন করতেন এবং সমাজে নারীদের অধিকার নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন।


প্রার্থনা সমাজের সদস্যরা হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি পুরোপুরি অমান্য করে চলতো না। ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হতে গেলে যেমন পৌত্তলিকতার আদর্শ পরিত্যাগ করতে হবে, তেমনি জাতিভেদ প্রথা অস্বীকার করা বাধ্যতামূলক ছিল। প্রার্থনা সমাজের আন্দোলনকে প্রতিবাদী হিন্দু আন্দোলন বলে উল্লেখ করা যেতে পারে। ব্রাহ্মসমাজের যেমন বারংবার ভাঙ্গন ধরে তা ভিন্ন ভিন্ন দল বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল প্রার্থনা সমাজের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটি হয়েছিল।


 আর্য সমাজ (Arya Samaj) :

দয়ানন্দ সরস্বতী (Dayanand Saraswati) প্রতিষ্ঠিত আর্য সমাজের মধ্যে আমরা হিন্দু পুনরুজ্জীবনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়ে থাকি। দয়ানন্দ সরস্বতীর জন্ম হয়েছিল কাথিয়াওয়ারের এক গোড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান। ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষা সম্পর্কে তিনি ছিলেন  অজ্ঞ,  এমনকি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইংরেজি বর্ণমালার সঙ্গে তার পরিচয় হয়নি। পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ না করলেও তিনি যে প্রগতিশীল ছিলেন না বা তার দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক ছিলনা, এমন কথা বলা যায়না। জনগণের ভাষার মাধ্যমে দয়ানন্দ জনগণের দরবারে হাজির হতে চেয়েছিলেন। 1875 সালে তিনি মুম্বাই শহরে আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। 1883 সালে তাঁর মৃত্যু হয়।


দয়ানন্দ সরস্বতীর ধর্মীয় ও সামাজিক চিন্তাধারার বিশাল অক্ষর গ্রন্থ হল "সত্যার্থ প্রকাশ"। তিনি নিজেকে হিন্দু বলে পরিচয় দিলেও উপনিষদ ও পুরাণের মতবাদে আস্থাশীল ছিলেন না। পুরান কে তিনি ভ্রান্ত বলে মনে করতেন। রামমোহন রায় বেদান্ত ও উপনিষদকে হিন্দু ধর্মের সার বলে মনে করলেও দয়ানন্দ বেদকে একমাত্র হিন্দু ধর্মের প্রধান উৎস বলে বিশ্বাস করেন। তাঁর আদর্শ ছিল বেদ ভিত্তিক সমাজ গঠন, তার বানী ছিল বৈদিক ধর্মের প্রত্যাবর্তন (Go Back to Vedas)। পৃথিবীর যাবতীয় ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও সত্য বেদের মধ্যে নিহিত আছে বলে তিনি মনে করতেন।


দয়ানন্দ সমাজ সংস্কার ও সংগঠন মূলক কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি বৈদিক আদর্শ অনুযায়ী চরিত্র গঠন ও নৈতিক জীবনের মান উন্নয়নের কথা বলতেন। তিনি মনে করতেন ঈশ্বর ও ভক্তের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য পুরোহিতের প্রয়োজন নেই। আর্য সমাজের প্রত্যেক সদস্য যাতে কেবলমাত্র বৈদিক ধর্মচারণ নয়, পাশাপাশি সমাজ সংগঠন মূলক নৈতিক ও জনহিতকর কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারে, তার জন্য তিনি সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে, বিধবাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন ও বন্যা, দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় দুর্গত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আর্য সমাজ ও সমাজ সেবার এক মহৎ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন।


👉 গান্ধীজী ও সত্যাগ্রহ আন্দোলন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন