Search Here

Most Recent

১২ আগস্ট, ২০২১

সুফিবাদ | Sufism | Medieval Indian History

  Sufism In India | Indian History

www.gkghor.in


সুফিবাদ | Sufism | Medieval Indian History


সুফিবাদ (Sufism) :

সুফিবাদ হলো ইসলাম ধর্মের রহস্যবাদ। সুফিবাদের মূল উৎস হল ইসলাম। এটি প্রেম-প্রীতির ওপর নির্ধারিত, যেখানে ইসলামিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক  কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আরবি শব্দ 'সাফা' থেকে সুফি কথাটি এসেছে। সর্বপ্রথম কুকার আবু হাসিম কে সুফি বলে মনে করা হত। বসরা ছিল প্রধান স্থান যেখানে বিভিন্ন সুফি সন্তরা  এসে রহস্য চর্চা করত।


 প্রমুখ সুফি শব্দাবলী :

  •  খানকা-  সুফি সন্তদের নিবাস স্থান।
  •  বলায়ত- আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র
  • সালিক- সাধক
  • মুরিদ বা তালিব- বিদ্যার্থী
  • পীর, শেখ- গুরু 
  • বরকত- সুফির আধ্যাত্মিক পবিত্রতা 
  • মশায়খ- সুফি সন্ত
  • হক- পরমাত্মা
  • বাসল- সৃষ্টি 
  • সিলসিলা-  শাব্দিক অর্থ হলো জঞ্জির বা শৃখল। এটি ছিল গুরু ও শিষ্যের মধ্যে এক নিরন্তর সম্পর্কে এর মাধ্যম।
  •  খিরকা-  সুফিদের অঙ্গ রক্ষক।
  •  খালিফা-  সুফিদের উত্তরাধিকারী যে তার কার্যকে আগে এগিয়ে নিয়ে যাবে। খিলাফত-  সুফি গুরু দ্বারা তার শিষ্যদের দেওয়া আধ্যাত্নিক অধিকার পত্র।


 সুফি সাহিত্য (Sufi Literature) :

কশপ-উল-মহজুব : লেখক ছিলেন আলহুজবিরি। এটি হলো সুফি মতবাদ এর উপর সবথেকে প্রসিদ্ধ রচনা। আলহুজবিরি এটি লাহোরে লিখেছেন।

মলফুজাত :  সুফি সন্তদের বার্তালাপ এখানে সম্মিলিত করা হয়েছে। প্রাম্ভিক মুলফুজাত হল ফয়ায়ত-উল-ফয়াত, যার লেখক ছিলেন আমির হাসান সিজ্জী দেহলবী। এই গ্রন্থে আমির হাসান তার নিজের গুরু নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার  বার্তালাপ সম্মিলিত করেছেন। ফারসি কবি আমির হাসানের পুরো নাম হল নিজামুদ্দিন হাসান। নিজামুদ্দিন হাসান আমীর খসরুর সাথী ছিলেন।

খের-উর-মজলিস : লেখক ছিলেন হামিদ কালান্দার। তিনি ফিরোজ তুঘলকের শাসনকালে নাসির উদ্দীন চিরাগ দেহলবীর বার্তালাপ সংকলন করেছিলেন।

জয়ামউলকালিম : এই গ্রন্থে গুলবর্গা সুফি গেসুদরাজের সংবাদ আছে, যা  আকবর হোসেনী সংকলন করেছেন।

 মকতুবাত :  সুফি সন্ততির তারা নিজেদের সহযোগীদের লেখাপত্র কে বলা হয় মকতুবাত।

 তাজকিরা :  সুফি সন্তদের জীবন বর্ণনা তাজকিরা তে অন্তর্ভুক্ত করা আছে।


 মহিলা সুফি সন্ত :

বসরার রাবিয়া প্রথম মহিলা সুফি সন্ত ছিলেন। তিনি মহিলাদের তিনটি গুণের কথা বলেছেন-  "সকল মহান পুরুষদের মহিলারা জন্মদিন দিয়েছেন এবং তাদের লালন-পালন করেছেন"। ভারতের সুফি মহিলাদের মধ্যে বিবি জুলেখা (নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মা), বিবি জামাল (মইনুদ্দিন চিশতির মেয়ে), বিবি করসুম (বাবা ফরিদের মা)  এবং বিবি সারা প্রমুখ ছিলেন। বিবি সরার মধ্যে বিভিন্ন রকম চমৎকার শক্তি ছিল। একবার দিল্লিতে খরা পড়েছিল বিবি সারার চমৎকার এর ফলে বর্ষা হয়।

জাহাঁআরা বেগম : জাহাঁআরা বেগম চিশতি সন্তদের সম্মানের জন্য মুনিস-আল-আরবাহ রচনা করেন। জাহাঁআরা বেগম একমাত্র মুঘল মহিলা সুফি ছিল। 


 প্রমুখ সুফি সিদ্ধান্ত :

 বহদত-অল-বজুদ :  অস্তিত্বের ঐক্য বা পরম তত্ত্ব বা সর্বেশ্বরবাদী সিদ্ধান্ত ছিল। যার প্রতিপাদক স্পেনি  সুফি ইবনে আরবি ছিল। ইবনে আরবির উপাধি ছিল শেখ-এ-আকবর। আকবর এই বিচারধারার সমর্থক ছিলেন।

আনহলক : এই সিদ্ধান্তের প্রতিপাদক ছিলেন মনসুর আল হাল্লাজ। ইনি বাগদাদের সড়কে নিজেকে আনহলক বলেছেন, যার কারণে এই সুফী কে ফাঁসি দেওয়া হয়। মনসুর সমুদ্রপথে ভারত ভ্রমণ করেছেন এবং হিন্দু বেদান্তবাদী দের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন ব্যক্তির স্বরূপ ঈশ্বরের অবতার হতে পারে।

বহদুত-অল-সদুত : এই সিদ্ধান্তের প্রতিপাদক ছিলেন শেখ আলাউদ্দিন সিমনানি। এটি ছিল প্রত্যক্ষবাদী দর্শন যেটি শরীয়তের উপর জোর দিত। সিমনানি ইবনে আরবির মানব একতা বিচারধারার খন্ডন করেছেন।

ইল্ম-এ-মুহমদিয়াঁ : খাজা মিরদার এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।


 মহত্বপূর্ণ  তথ্য (Important Facts) :

 ভারতে সুফিবাদের প্রবেশ আরবদের সিন্ধু বিজয়ের পশ্চাতে ঘটেছে। শেখ আল হুজবিরি যার উপাধি ছিল দাতাগঞ্জ, তিনি মহম্মদ গজনির সময়ে তুর্কি সেনাদের এক বন্দী রূপে সিন্ধু পার করে ভারতে প্রবেশ করেন। লাহোরে তার দরগা কে 'দাতা দরবার'  নামে পরিচিত। পীর সদরুদ্দিন ভারতে খোজহ  সম্প্রদায়ের প্রচার করেছেন। ভারতের সব থেকে প্রথমে বসতি করেছিল সৃষ্টি সুফি সখি সরবর।


 সুফিদের অবদান (Contribution Of Sufism) :


  • সংগীতের বিকাশে সূফীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মইনুদ্দিন চিশতী সংগীতকে আত্মার  পৌষ্টিক আহার মনে করতেন। সুফি পীর বোধন কে সেই সময়ের  দ্বিতীয় সর্বশেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ মনে করা হতো। সুফিদের সঙ্গীতের সভাতে সমা থেকে ভারতে ইরানী রাগ এবং রাগিণীর বিস্তার হয়েছিল। কিছু নতুন সংগীত যন্ত্র যেমন সিতার, তবলা এবং নতুন সংগীত রাগ যেমন এমন, ঘোর সাজগিরি  প্রভৃতির জন্ম হয়েছিল। আমির খসরু কৌলের প্রচলন করে চিশতির সমাকে একটি বিশিষ্ট রূপ দিয়েছিল।
  • ভাষা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রেও সূফীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। সুফিদের খানকাতে উর্দু ভাষার জন্ম হয়েছে। হোসেন শাহ এবং বুল্লে শাহ পাঞ্জাবি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাদশা জাহাঙ্গীরের সময়কালের চিশতী সুফি উসমান চিত্রাবলী নামক প্রেম কাব্যের রচনা করেছেন।
  • সুফিরা নগরীকরণ প্রক্রিয়াকে নিজেদের ধাঁচে প্রতসাহিত করেছেন। সুফিরা নিজেদের খানকা গুলোকে জঙ্গলে বানিয়েছিলেন।


  •  সুফি সন্তরা হিন্দু সমাজ এবং মুসলিম সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধনের কার্য করেছিলেন। তারা এক সমন্বিত সংস্কৃতির বিকাশে যোগদান দিয়েছিলেন। সুফি সন্তরা ভারতের ধার্মিক উদারতার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দান করেছেন। এনারা উত্তর ভারতের প্রচলিত হিন্দু সম্প্রদায়কে ইসলাম ধর্মের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সুফিদের হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক পূজা করতেন, যেমন সিন্ধুর পীর আরিয়া এবং লাল শাহবাজ যাদের হিন্দুরা বিষ্ণুর অবতার বলে মনে করতেন। বাংলায় গাজী মিয়াকে হিন্দু সত্যবীর নামে পূজা করা হতো।


  • সুফি সন্তরা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত প্রক্রিয়াকে প্রতসাহন দিয়ে মুসলিম শাসনের সামাজিক আধার নির্মিত করেছিলেন।


ইতিহাসকারক আল বেরুনী বলেছেন হিন্দুরা ওই সব জিনিসকে গ্রহণ করতেন না যেগুলি মুসলিমদের  আগুন বা জলের সম্পর্কে এসেছিল। মূলত তুর্কিদের আক্রমণ ভারতীয় জনতা দের মনে এক ক্রোধের সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সুফিরা ভারতীয় জনতা দের সম্মুখে ইসলামের এক মানবীয় ছবি প্রস্তুত করেছিল। পরে আকবর সুফি সহিষ্নুতার বহদাদ-উল-বজুদ বিচারধারা কে নিজের ধার্মিক বিচারধারার আধার বানিয়েছিলেন।


 সুফি সিলসিলা (Sufi Silsila) :

সুফী সৈয়দ জাহাঙ্গীর বা সিমনানী এবং আবুল ফজল মোট 14 প্রকার সুফি সিলসিলা কথা উল্লেখ করেছেন। মহত্বপূর্ণ হল যে এই সুফি সিলসিলা গুলির মধ্যে কোন সিলসিলাই ভারতে উৎপন্ন হয় নি। কাদিরিয়া এবং নকশাবন্দী সিলসিলা কে প্রতিক্রিয়াবাদী সিলসিলার অন্তর্গত করা হয়। সুফি সিলসিলার বিভাজন দুটি শ্রেণীতে করা হয়ে থাকে।

বা-শরা-  এই শ্রেণীতে শরীয়তের প্রধানত স্বীকার করে নেওয়া হয় এক্ষেত্রে বুজুধদয়া এবং শুহুদিয়া প্রমুখ ছিলেন।

বে-শরা-  এই শ্রেণীতে শরীয়তের আদেশকে অমান্য করা হতো। এক্ষেত্রে মলং, কালান্দার, মাদারি, হায়দারি এবং  সদা সুহাগন  প্রমুখ ছিলেন। 


বিঃদ্রঃ পরের পর্বে আমরা সুফি সিলসিলা গুলি নিয়ে বিস্তারিত করবো।  


👉 মুঘল যুগ। Mughal Empire  


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন