Search Here

Most Recent

৩০ জুলাই, ২০২১

শিল্পায়ন | Industrialization In Colonial Period | Modern Indian History

Industrialization in Colonial Period

 ব্রিটিশ ভারতে শিল্পের বিকাশ

www.gkghor.in
Modern Indian History | Indian History Question Answer 


আধুনিক শিল্পের বিকাশ (Modern Industry):

ঊনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ভারতে আধুনিক বস্ত্র শিল্পের উদ্ভব ঘটে। এই শিল্পায়নের গতি ছিল শ্লোত|  বিশেষত, পশ্চিমী দেশগুলির তুলনায় লৌহ ইস্পাত শিল্প শুরু হয়েছিল দেরিতে, কিন্তু প্রগতির গতি ছিল। বাকি অন্যান্য শিল্প ছিল যথেষ্ট পিছনে। ভারতে এই শিল্পায়নের পথ অবশ্যই কুসুমাকীর্ণ ছিলনা। শিল্পোদ্যোগী রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ছিল না বললেই হয়। ভারতের শিল্পায়ন হয়েছিল মূলত বেসরকারি প্রচেষ্টায় এবং কোন খাতে কত অর্থ বা সম্পদ বিনিয়োগ করা হবে সে সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা। ইংরেজ আমলে ভারতের জনসংখ্যা বাড়লেও শিল্পজাত দ্রব্য সামগ্রিক চাহিদা বাড়েনি, গড়পরতা জাতীয় আয় ছিল অল্প। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ছিল খুব বেশী। মূল্যবান যন্ত্রপাতি সবেই বাইরে থেকে আনতে হতো। দক্ষ কারিগর ও প্রযুক্তিবিদদের অভাব ছিল। জ্বালানি ছিল আরেক সমস্যা। অবশ্য কাঁচামাল ছিল অঢেল এবং অল্প পারিশ্রমিকে শ্রমিকের অভাব ছিল না। কিন্তু নানা বাধা বিপত্তি থাকা সত্বেও ভারতে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া  বিশেষ উল্লেখযোগ্য। 1857 থেকে 1914 সালের মধ্যে ভারত পাটশিল্পে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে। বস্ত্র শিল্পে ভারতের স্থান ছিল পৃথিবীর মধ্যে চতুর্থ অথবা পঞ্চম। দৈর্ঘ্যের মাপকাঠিতে ভারতের রেলপথ ছিল পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয়। আমরা এখন নিচে কয়েকটি শিল্প প্রয়াসের কথা আলোচনা করব।


বস্ত্র শিল্প (Textile Industry):

ভারতীয় বস্ত্র শিল্পের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন ও সুমহান। 1854 সালে পার্সি কাওয়াসি নানাজি দাভার ভারতে প্রথম সুতি কল স্থাপন করলেও কোম্পানির আমলেই বাংলা, পন্ডিচেরি ও ব্রোচে বিদেশিদের প্রচেষ্টায় সুতি কল স্থাপনের কথা জানা যায়। দাভারও 1851 সালে সুতি কল স্থাপন করার জন্য প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন। 1854 সালে মুম্বাই শহরে 50 জন ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় মূলধন সংগ্রহ করে তিনি ভারতের প্রথম সুতাকল স্থাপন করেন। জন্ম লগ্ন থেকেই ভারতের সুতি বস্ত্র শিল্প ভারতীয় বিশেষত পার্সি সম্প্রদায়ের হাতে ছিল। প্রথমদিকে ভারতের বস্ত্র বয়ন শিল্পের উন্নতি ঘটেছিল মন্তর গতিতে। 1865 সালের মধ্যে বোম্বাইতে মাত্র 10 টি সুতি কল স্থাপিত হয়েছিল। 1860 থেকে 1870 সালের মধ্যে বস্ত্রশিল্পে প্রধানত দুটি কারণে ভাটা পড়েছিল। প্রথমটি হলো আমেরিকার গৃহযুদ্ধ, যার ফলে তুলোর দাম অনেক বেড়ে যায়। দ্বিতীয় কারণটি হলো অর্থনৈতিক মন্দা।


কিন্তু আঠারোশো নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই বস্ত্র শিল্পের সঙ্কট ঘনীভূত হয়। 1893 সালে বিদেশে ভারতের সুতি বস্ত্রের চাহিদা হ্রাস পায়। জাপান ভারতের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার দখল করে। বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্বেও 1890 থেকে 1914 পর্যন্ত ভারতে বস্ত্র শিল্পের উন্নতির ব্যাখ্যা করা সম্ভব। প্রথমত জাপানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এশিয়ার সুতোর বাজার নষ্ট হওয়ায় বোম্বাইয়ের মিল মালিকরা কাপড় তৈরীর দিকে নজর দেয়। ঊনিশ শতকের শেষ চার বছরে ভারতের সুতো কল গুলি যত পরিমাণ সুতো তৈরি করত, কাপড় তৈরি করত তার 17 থেকে 18 শতাংশ।


1939 থেকে 1947 সাল পর্যন্ত সময়কাল ভারতীয় বস্ত্র শিল্পের একটি দ্রুত উন্নতিতম পর্যায় বলে মনে করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও ভারতীয় মিল মালিকদের কাছে আশীর্বাদ স্বরূপ ছিল। বিদেশ থেকে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। 1942 সাল থেকে ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোতে জাপানি বাজার নষ্ট হয়। দেশে-বিদেশে ভারতীয় বস্ত্রের বিপুল চাহিদা ভারতীয় মিল মালিকদের এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু যুদ্ধকালীন চাহিদা মেটাতে ভারতের শিল্পপতিরা হিমশিম খেয়ে যায়। দেশের ভিতরে কাপড়ের জন্য হাহাকার পড়ে যায়। কাপড়ের দাম হুহু করে বাড়তে থাকে আসলে চারদিকে চাহিদা মেটাতে দেশের ভেতরে এক ধরনের কৃত্রিম অভাবের সৃষ্টি হয়। যাইহোক এর ফলে সাধারণ দরিদ্র মানুষের দুঃখ কষ্টের অতীত ছিল না। বোম্বাই আমেদাবাদের মিলমালিকদের মুনাফার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছিল গরিব মানুষকে। 


পাট শিল্প (Jute Industry):

ভারতে পাট শিল্পের সূচনা হয়েছিল বস্ত্র শিল্প বিকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (East India Company)  দীর্ঘদিন ধরেই পাটের ব্যবসা করে আসছিল। দড়ি তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে পাটের চাহিদা ছিল। 1830 এর দশক পর্যন্ত চটের থলে ও পাটের কাপড় বাংলার হস্তশিল্পীদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। কিন্তু এই সময়ে স্কটল্যান্ডের ডান্ডির পাটকলে কাঁচামাল হিসেবে পাট রপ্তানি শুরু হওয়ায় বাংলার এই কুটিরশিল্প পতনের মুখে এসে দাঁড়ায়। ভারত থেকে পাট আমদানি করে ডান্ডির কারখানায় পাটজাত দ্রব্য তৈরি করতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হত, তাই বাংলায় পাট শিল্প গড়ে তোলা অনেক লাভজনক ছিল। ভারতের প্রথম চটকল স্থাপিত হয়েছিল 1855 সালে কলকাতার কাছে রিষড়ায়। জর্জ অকল্যান্ড নামের জনৈক ইংরেজ তিনি এই  চটকল স্থাপন করেছিলেন। তাকে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন বিশ্বম্ভর সেন নামে একজন বাঙালি। প্রথম দু'বছরে এই ছোট কারখানাটিতে কেবলমাত্র সুতো বোনা হত। এই কারখানা অবশ্য খুব বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এরপর 1859 সালে বরানগরে প্রথম বাষ্প চালিত পাটকল স্থাপিত হয়। এখানে কাপড় বোনা হত। 1862 সালের আরো দুটি পাটকল গৌরীপুর ও সিরাজগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়। একমাত্র অকল্যান্ড প্রতিষ্ঠিত কারখানা ছাড়া বাকি সমস্ত কারখানায় প্রচুর টাকা লাভ করতে থাকে। 1870 দশকের পর পর্যন্ত পাট শিল্পের উন্নতির গতি ছিল খুবই মন্থর ছিল।


লৌহ ও ইস্পাত শিল্প (Iron Industry):

ইউরোপীয়দের প্রয়োজন ও চাহিদা মেটাতে ভারতে আধুনিক লৌহ শিল্পের সূত্রপাত হয়েছে। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন জোসিয়া মার্শাল হীথ  নামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারী। উচ্চ মানের লোহার যোগান থাকা সত্ত্বেও ভারতের লৌহ ইস্পাত শিল্পের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় কারন হলো অভিজ্ঞতা ও পুঁজির অভাব। যন্ত্রপাতি কিনতে প্রচুর টাকা খরচ হয়েছিল অথচ ইংল্যান্ড থেকে আনা যন্ত্রপাতির একটা অংশও ব্যবহারের উপযোগী ছিলনা। তাছাড়া জ্বালানির অভাব একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কয়লার অভাবে কাঠ কয়লা দিয়ে কাজ চালানো হয়েছিল।


উনিশ  শতকের গোড়ার দিকে ভারতের লৌহ ইস্পাত শিল্পের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। 1907 সালে "টাটা আয়রন এন্ড ষ্টীল" (Tata Iron And Steel Company) কোম্পানি স্থাপিত হয়। এটি ভারতীয় প্রচেষ্টায় স্থাপিত প্রথম এবং সর্ববৃহৎ লৌহ ও ইস্পাত কারখানা। জামসেদজী টাটা শিল্পপতি জীবন শুরু হয় বোম্বাই ও নাগপুরের সুতি কল স্থাপনের মাধ্যমে। লৌহ ইস্পাত শিল্প সম্পর্কে তাঁর আগ্রহের সূত্রপাত হয়েছিল 1882 সালে। ঊনিম শতকের শেষদিকে অনুকূল সরকারি নীতি তাকে লৌহ ইস্পাত কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু সরকারি আনুকূল্য যে যথেষ্ট নয় তাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। এইসব নানা দিক ভেবে চিন্তে তারপর তিনি বিহারের সাকচিতে অর্থাৎ টাটানগরে কারখানা স্থাপন করেন। অন্যদিকে স্বদেশী আন্দোলনের আবেগও টাটা কোম্পানির উন্নতিতে সহায়ক হয়েছিল। টাটা কোম্পানির মূলধন বা পুজী সংগৃহীত হয়েছিল দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে। যদিও পার্সিদের প্রাধান্য ছিল সর্বাধিক।


           এছাড়াও অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে চিনি শিল্পের (Sugar Industry) ঐতিহ্য ছিল। ভারতের চিনি এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে বিক্রি হতো। কিন্তু ইংরেজ আমলের বিদেশি চিনি ভারতের বাজার দখল করতে থাকে। এই চিনি প্রথমে মরিশাস ও পরে অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি থেকে আসতো। 1924 সালে পর চিনির দাম কমতে থাকে ও ভারতের প্রচুর বিদেশি চীনে আসতে থাকে। ভারতে বিদেশি চিনির এই আধিপত্য দেশীয় শিল্প বিকাশের পথে একটা বড় বাধাস্বরূপ ছিল। ঊনিশ শতকের গোড়ায় ভারতে আধুনিক চিনি শিল্পের উদ্ভব ঘটে এবং 1931 সালের মধ্যে ত্রিশটির মতো চিনিকলে 1 লাখ 58 হাজার টন চিনি উৎপন্ন হতো।


ইংরেজরা এ দেশে আসার আগেও কাঁচ শিল্প ভারতীয়দের কাছে অজ্ঞাত ছিল না। তবে আধুনিক দৃষ্টিকোণে তার মান অবশ্যই উন্নত ছিল না। যাইহোক উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতের কয়েকটি কাঁচ কল স্থাপিত হয়। কিন্তু আধুনিক ইউরোপীয় কাঁচ শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা দাঁড়াতে পারেনি। ফলে এদের অধিকাংশই উঠে যায়।


১৮৭০  সালে হুগলি নদীর তীরে বালিতে কাগজ কল (Paper Industry) স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে কাগজ শিল্পের সূত্রপাত হয়। এরপর একে একে 1879 সালে 1882 সালে এবং 1890 সালে 1830 সালে রানীগঞ্জে কাগজ কল স্থাপিত হয়।


এছাড়াও 19 শতকের গোড়ার দিকে ভারতের সিমেন্ট শিল্পের (Cement Industry) সূত্রপাত হয়েছিল এবং সামরিক বিভাগের প্রয়োজন মেটাতে উনিশ শতকের মধ্যভাগে ভারতে চর্ম শিল্পের (Leather Industry) বিকাশ ঘটেছিল। এই সময় চামড়া পাকা করার আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব শিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল তার মধ্যে রাসায়নিক শিল্প ও অ্যালুমিনিয়ামের শিল্প প্রধান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত রাসায়নিক পদার্থ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বন্ধ হওয়ায় এই শিল্পের প্রসার ঘটে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় রাসায়নিক দ্রব্যের উৎপাদন যথেষ্ট ছিল না বলে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার এই শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল। 1943 সালে আর একটি কারখানায় স্থাপিত হয় এই সব কারখানায় অ্যালুমিনিয়ামের চাদর ও অন্যান্য দ্রব্য প্রস্তুত হতো।


👉Modern Indian History MCQs


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন